Written by Pritam Karan Singha in সময়ের বিতর্কদর্শন

ঈশ্বরের নামে আগুন—কার অধিকার?

ঈশ্বরের নামে আগুন—কার অধিকার?

যদি সত্যিই প্রশ্ন করাই অপরাধ হয়,
তবে পৃথিবীর সব প্রশ্নকারীই আগুনের যোগ্য।
কিন্তু ইতিহাসে আগুন প্রস্তুত থাকে
তবে সব প্রশ্নকারীর জন্য নয়—
নির্বাচিত কিছু মানুষের জন্য।

কেন?

একজন সাধারণ মানুষ—
খেটে খাওয়া, অরাজনৈতিক, ক্ষমতাহীন—
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে,
আর ঈশ্বরের নামে আগুন জ্বলে ওঠে।
অথচ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে
নিজেরাই নিজ বিশ্বাসকেই কঠিনতম ভাষায় প্রশ্ন করে,
গ্রন্থের শব্দ ধরে ধরে সমালোচনা করে—
সেখানে আগুন নামে না।

তাহলে প্রশ্নটা অপমানের নয়।
প্রশ্নটা ক্ষমতার।

যদি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হন,
তাঁকে রক্ষা করতে
মানুষের হাতে আগুন কেন?
আর যদি আগুন ধরানোই ধর্মরক্ষা হয়,
তবে যারা সেই ধর্মের
সবচেয়ে কঠোর বিধান নিজেরাই বহন করে না,
তারা বিচারক হয় কীভাবে?

যারা গান গায়, শোনে, ছবি আঁকে, দেখে, অভিনয় করে,
উৎসবে যায়, ভিন্ন সংস্কৃতিকে সম্মান করে—
তারা কি কম বিশ্বাসী?
আর যারা আগুন ধরায়—
তারাই কি একমাত্র সত্যের ধারক?

এই দ্বিচারিতা কোথা থেকে আসে?

এখানেই গভীর সত্যটি উন্মোচিত হয়—
ঈশ্বর ও মানুষের মাঝখানে
একটি ক্ষমতাকাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে।
এই কাঠামো ঈশ্বরের কথা বলে,
কিন্তু ঈশ্বরের মতো আচরণ করে না।
এরা বিশ্বাস শেখায় না—
এরা আনুগত্য চায়।
এরা প্রশ্ন সহ্য করে না—
কারণ প্রশ্ন করলে
তাদের ক্ষমতা ভেঙে পড়ে।

এই জন্যই আগুন সবসময়
দুর্বলদের জন্য।
এই জন্যই ক্ষমতাবান প্রশ্নকারীরা
নিরাপদ থাকে।

যদি সত্যিই ঈশ্বরের সঙ্গে
মানুষের সম্পর্ক পবিত্র হয়,
তাহলে মাঝখানে এই দালালদের দরকার কী?
ঈশ্বর যদি ন্যায় হন,
তবে ন্যায়ের নামে
হিংসার অনুমতি
মানুষ পেল কোথা থেকে?

সমস্যা ঈশ্বরে নয়।
সমস্যা সেইসব মানুষের হাতে,
যারা ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে
মানুষ মারার অধিকার দাবি করে।
সমস্যা সেই ক্ষমতায়,
যা প্রশ্নকে পাপ বানায়
আর আগুনকে নীতি।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—
এই সবকিছু ঘটে নীরবতার মধ্যে।
যখন কেউ চুপ থাকে,
আগুন সাহস পায়।
যখন প্রশ্ন থেমে যায়,
হিংসা শাস্ত্র হয়ে ওঠে।

আজ যারা চোখ ফেরায়,
কাল তারাই চোখ ভেজায়।
আজ যারা যুক্তি সাজায়,
কাল তারাই শোকের মিছিল করে।
কিন্তু ইতিহাস কান্না শোনে না—
ইতিহাস হিসাব রাখে।

প্রশ্নগুলো তাই উঠতেই হবে—
যদি প্রশ্ন করাই অপরাধ হয়,
তবে সকল প্রশ্নকারীরা কেন সর্বত্র একভাবে শাস্তি পায় না?
যদি বিশ্বাসের শুদ্ধতাই বিচার্য হয়,
তবে কেন বাছাই করা রাগ?
কেন আগুন যায় সেই দিকেই,
যেখানে প্রশ্নের জবাব দিতে হয় না?

এখানেই সত্য স্পষ্ট—
সমস্যা বিশ্বাসে নয়।
সমস্যা বিশ্বাসের নামে তৈরি করা দালালি ক্ষমতায়,
যারা ঈশ্বরের প্রতিনিধি সেজে
মানুষের বিচার করতে চায়।

যেখানে নিজেরাই সেই বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে অক্ষম।

এই প্রশ্ন তোলা অপমান নয়।
এই প্রশ্ন তোলা দায়িত্ব।
কারণ প্রশ্ন না তুললে
সত্য চাপা পড়ে।
আর চাপা পড়া সত্যই
সবচেয়ে ভয়ংকর আগুন।

এই লেখা সেই অগ্নিবাণী—
যা পাপকে নাম ধরে ডাকে,
আর নীরবতাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

ঈশ্বরের নামে আগুন—
কার অধিকার?


স্বাক্ষর বাণী —
প্রীতম করণ সিংহ 
শান্তিনিকেতন 

রচনা : সমকালীন এক ঘটনার প্রেক্ষিতে রচিত দার্শনিক গদ্য 
প্রকাশ : ২২ শে ডিসেম্বর ২০২৫


© প্রীতম করণ সিংহ |
সমস্ত লেখা ও ভাবনা কপিরাইট দ্বারা সুরক্ষিত। অনুমতি ব্যতীত পুনর্মুদ্রণ, অনুবাদ, পরিবর্তন বা ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয়। এই লেখা শেয়ার করার অনুমতি থাকলো, তবে কপি করা অথবা এর ভাষা, ভাব বা অংশ বিশেষ পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ।



0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x